এআই (AI) টুলের ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা চাওয়া হয়েছে

 



এআই (AI) টুলের ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা চাওয়া হয়েছে। সোর্সগুলিতে এআই টুলের ব্যাপক ব্যবহার, এর সুবিধা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর প্রভাব সম্পর্কে প্রচুর তথ্য দেওয়া হয়েছে।

নীচে এআই টুলের ব্যবহার ও এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা করা হলো:
১. এআই টুলের প্রয়োজনীয়তা ও চাকরির বাজারে প্রভাব
এআই এখন ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশ হয়ে উঠেছে। চ্যাট জিপিটি-এর প্রতিষ্ঠাতা স্যাম অল্টম্যানের মতে, এআই এখন এতটাই উন্নত হয়েছে যে এটি কোডিংয়ের অনেক কাজ গ্রাস করছে বা করবে
ভারতে টিসিএস (TCS)-এর মতো বড় কোম্পানিও ১২,০০০ কর্মচারী ছাঁটাই করেছে; যদিও এটি দক্ষতা-এর অভাব (skill gap) হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তবে বাস্তবে এই দক্ষতা-এর অভাব পূরণে এআই টুলগুলো আরও ভালোভাবে এবং কম সময়ে কাজ করতে শুরু করেছে
বলা হয়েছে, যদি আপনি এআইকে আপনার জীবনে ব্যবহার করা শুরু না করেন, তবে অন্য কেউ এক সপ্তাহের মধ্যে এআই শিখে আপনার ১০ বছরের অভিজ্ঞতাকে ছাড়িয়ে যাবে
বর্তমানে এআই ব্যবহার করে সপ্তাহে অন্তত ১০ ঘণ্টা সময় বাঁচানো অত্যন্ত জরুরি, অন্যথায় আপনি বিশ্বের থেকে পিছিয়ে পড়ছেন বলে ধরে নেওয়া হবে। যে এই "ট্রেনে" চড়বে, সে সাফল্যের গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছাবে
পূর্বে কোডিং শেখার পরামর্শ দেওয়া হলেও, এখন এআই সম্পর্কিত টুলস এবং প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং-এর উপর মনোযোগ দিতে বলা হচ্ছে
২. কনটেন্ট তৈরি ও সৃজনশীল কাজে এআই টুলের ব্যবহার
এআই টুলগুলি কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তা (entrepreneur)-দের জন্য সময় এবং অর্থ বাঁচাতে সাহায্য করে
২.১. ইমেজ ও ভিডিও তৈরি এবং সম্পাদনা:
ন্যানো ব্যানানা (Nano Banana): এটিকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইমেজ এডিটিং মডেল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এটি এমন স্তরের সম্পাদনা সম্ভব করেছে যা আগে কখনও সম্ভব ছিল না। আপনি আপনার ছবি আপলোড করে প্রম্পট ব্যবহার করে আপনার ছবিটিকে যেকোনো স্থানে বা বিখ্যাত ব্যক্তির পাশে বসাতে পারেন, যেখানে আপনার মুখের অভিব্যক্তি অপরিবর্তিত থাকবে। এটি জেমিনি (Gemini)-এর একটি টুল এবং গুগল ওয়ান এআই প্রিমিয়াম-এর মাধ্যমে এর পেইড সংস্করণ পাওয়া যায় (যা প্রায় $20 বা ₹2000)। এই টুলটি ফটোশপের মতো ইমেজ এডিটিং ইন্ডাস্ট্রিতে চাকরি হারানোর কারণ হতে পারে
ক্লিং (Kling): এই টুলটি ইমেজে মোশন যোগ করে এবং সেগুলিকে ভিডিওতে রূপান্তর করে। এটি আপনার ধারণাকৃত ইমেজকে প্রাণবন্ত করতে পারে এবং বিজ্ঞাপনের জন্য মোশন গ্রাফিক্স বা কনসেপ্ট ভিডিও তৈরি করতে অত্যন্ত সহায়ক, যার জন্য আগে লাখ লাখ টাকা খরচ হতো
গুগল ভি৩ (Google VWO3): এর সাহায্যে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ছবি ও ভিডিও তৈরি করা যায়। এটি আপনার সৃজনশীল ধারণাগুলিকে (যেমন, মহাকাশে হীরার বৃষ্টি) বাস্তবে রূপ দিতে পারে যা আগে ক্যামেরায় শুট করা সম্ভব ছিল না
হিক্সফিল্ড (Hixfield): এটি ইমেজে প্রাণ দিতে এবং একটি ইমেজ থেকে অন্য ইমেজে যাওয়ার জন্য সেরা ট্রানজিশন (transition) তৈরি করতে দারুণ সাহায্য করে। এতে "আর্থ জুম ইন/আউট," "গলানো" এবং "অ্যানিমালাইজেশন" (মানুষকে প্রাণীর রূপে পরিবর্তন) সহ অনেক ভিজ্যুয়াল এফেক্ট রয়েছে
আইডিওগ্রাম (Ideogram): এটি ইমেজ তৈরির জন্য একটি বিনামূল্যের টুল, যা মিডজার্নি-এর একটি বিকল্প। এটি ইউটিউব ভিডিওর জন্য থাম্বনেইল কনসেপ্ট তৈরি করতেও সাহায্য করে
ডেসক্রিপ্ট (Descript): এই টুলটি শুধুমাত্র টেক্সট দিয়ে ভিডিও সম্পাদনা করতে সাহায্য করে। এটি ভিডিও থেকে অপ্রয়োজনীয় শব্দ ("আ," "ওকে") দূর করতে পারে এবং ভুল শব্দ ওভারডাব (overdub) করার মাধ্যমে ভুল সংশোধন করতে সাহায্য করে, যা রেকর্ডিং না করেও কাজ আটকে যাওয়া থেকে মুক্তি দেয়
২.২. ভয়েস এবং ভিডিও নির্মাণ:
হেজেন (HeyGen): এটি টেক্সট থেকে সরাসরি ভিডিও তৈরি করতে পারে। যারা ক্যামেরার সামনে আসতে লজ্জা পান বা ভয় পান, তারা নিজেদের অবতার (avatar) তৈরি করে বা ভিন্ন লিঙ্গ/আকৃতির অবতার ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি করতে পারেন। এতে লিপ-সিঙ্কিং (lipsync) সহ বহুলভাষিক ডাবিংয়ের (multi-lingual dubbing) সুবিধা রয়েছে
ইলেভেন ল্যাবস (Eleven Labs): পর্যাপ্ত ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষণ দিলে এটি ব্যবহারকারীর কণ্ঠস্বরের একটি ক্লোন তৈরি করে। এটি কণ্ঠস্বরকে কাজে লাগিয়ে কন্টেন্ট তৈরি করতে সাহায্য করে, বিশেষ করে যখন অসুস্থতা বা সময়ের অভাবে নিজে রেকর্ড করা সম্ভব হয় না। ইলেভেন ল্যাবস এবং হেজেন একত্রে ব্যবহার করে অনেক ক্রিয়েটর কোটি কোটি ভিউ অর্জন করছেন (যেমন বরুণ মায়া)
সুনো.এআই (Suno.ai): এটি সম্পূর্ণ গান এবং মিউজিক তৈরি করতে পারে। এটি ইউটিউবের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, পডকাস্টের জন্য মিউজিক বা বিজ্ঞাপনের জন্য হুক (जिंगल) তৈরি করতে পারে। এটি প্রম্পট অনুযায়ী লিরিক্স, ভোকাল এবং ইনস্ট্রুমেন্ট তৈরি করে পুরো মিউজিক অডিও তৈরি করতে সক্ষম
৩. গবেষণা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যবহার
গবেষণা এবং ধারণা স্পষ্টীকরণের জন্য এআই টুলগুলি অত্যন্ত শক্তিশালী
ক্লড এআই (Claude AI): এটি গবেষণার জন্য চ্যাট জিপিটি-এর চেয়েও উন্নত বলে মনে করা হয়। এটি বড় পিডিএফ ফাইলগুলি ভালোভাবে হ্যান্ডেল করতে পারে এবং গভীর গবেষণামূলক স্ক্রিপ্ট তৈরিতে সাহায্য করে। শিক্ষার্থীরা এর সাহায্যে বইয়ের পিডিএফ আপলোড করে নির্দিষ্ট প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারে
নোটবুক এলএম (Notebook LM): এটি গুগলের একটি পণ্য, যেখানে বইয়ের পিডিএফ আপলোড করে সেগুলির সাথে চ্যাট ফরম্যাটে কথা বলা যায়। এটি জটিল ধারণাগুলিকে সহজ ভাষায় বোঝানোর জন্য দারুণ কার্যকর (যেমন, "পাঁচ বছর বয়সী শিশুর মতো করে বুঝিয়ে দাও" এমন প্রম্পট ব্যবহার করা যেতে পারে)। এটি ব্যক্তিগত গৃহশিক্ষকের (private tutor) মতো কাজ করে, যার ফলে বারবার প্রশ্ন করে ধারণা স্পষ্ট করা যায়
পারপ্লেক্সিটি (Perplexity): গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সাইটেশন (citations) খুঁজে বের করার জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর। এটি ফলো-আপ প্রশ্নগুলির উপর ভালো নিয়ন্ত্রণ রাখে। যারা এয়ারটেল (Airtel) ব্যবহারকারী, তারা বিনামূল্যে এর এক বছরের সাবস্ক্রিপশন পেতে পারেন
এলিসিট (.org): এটি সুপার হিউম্যান গতিতে গবেষণা করতে পারে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ভুল রিপোর্ট সরবরাহ করে। কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের দ্বারা দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করার জন্যও এটি উপযোগী
এক্সপ্লেইন পেপার (Explain Paper): এটি ঘন পিডিএফ (dense PDFs) বা বইয়ের বিষয়বস্তু সরলীকৃত করে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করে
সাইট এস.এআই (Cite S.ai): এটিও গবেষণার জন্য ব্যবহৃত হয় এবং ফ্যাক্টস, ফিগার এবং প্রাসঙ্গিক গবেষণা খুঁজে বের করতে সাহায্য করে
৪. ব্যবসার জন্য এআই টুলের ব্যবহার
ব্যবসায়ী এবং একক উদ্যোক্তাদের (solo-entrepreneurs) জন্য একাধিক টুল তাদের কাজকে স্বয়ংক্রিয় করতে সাহায্য করে।
জ্যাসপার (Jasper) ও কপি.এআই (Copy.ai): বিজ্ঞাপন লেখার জন্য, ল্যান্ডিং পেজের কনটেন্ট, ইমেল বা ব্র্যান্ডের ভাষাকে স্কেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য কপিরাইটিংয়ের কাজে এই টুলগুলো খুব ভালো
গামা (Gamma) ও টোম.অ্যাপ (Tome.app): এই টুলগুলি দিয়ে আকর্ষণীয় প্রেজেন্টেশন (পিচ ডেক) বা রিপোর্ট দ্রুত তৈরি করা যায়, যা বিনিয়োগকারীদের কাছে উপস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয়
ফায়ারফ্লাই (Fireflies) ও ফ্যাথম (Fathom): এই টুলগুলি জুম (Zoom) এবং অন্যান্য সিআরএম (CRM)-এর সাথে যুক্ত হয়ে মিটিংয়ের নোটস স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি করে, যাতে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি ভুলে যাওয়া না হয়
ডিপসিক (Deepseek): এটি চ্যাট জিপিটি-এর প্রতিদ্বন্দ্বী এবং এটি যুক্তিসহ (with logic) গভীর গবেষণা করে। এটি ডেটা বিশ্লেষণ, কোড তৈরি এবং দীর্ঘ সময় ধরে কনটেক্সট (context) বজায় রাখতে পারে
কাটানা.ক্লাউড (Katana.cloud) ও ইনভেন্টরি প্ল্যানার: একক উদ্যোক্তাদের ইনভেন্টরি, রিঅর্ডার এবং স্টক অ্যালার্ট পরিচালনা করতে সাহায্য করে
টেক্সট কর্টেক্স (Text Cortex): এর সাহায্যে একটি এজেন্ট (AI representative) তৈরি করা যায়, যা আপনার হয়ে ২৪/৭ কাজ করবে, যেমন মার্কেটিং। এটি এভারনোট, স্ল্যাক, ড্রাইভ, মেল ইত্যাদির সাথে যুক্ত হতে পারে
৫. গুগল ক্রোম এক্সটেনশনের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি
সোর্সগুলিতে কয়েকটি শক্তিশালী গুগল ক্রোম এক্সটেনশনের উল্লেখ আছে যা দৈনন্দিন কাজকে সহজ করে।
প্রিন্টার ফ্রেন্ডলি ও পিডিএফ (Printer Friendly & PDF): এটি যেকোনো ওয়েবপেজ থেকে বিজ্ঞাপন এবং অপ্রয়োজনীয় উপাদান বাদ দিয়ে শুধুমাত্র আর্টিকেলের প্রিন্ট বা পিডিএফ নিতে সাহায্য করে, যা অফিস বা নোট তৈরির জন্য দারুণ
অসাম স্ক্রিনশট ও স্ক্রিন রেকর্ডার (Awesome Screenshot & Screen Recorder): এটি সম্পূর্ণ পেজসহ যেকোনো অংশের স্ক্রিনশট নিতে পারে এবং স্ক্রিন রেকর্ড করতে পারে। এটি বিনামূল্যে ৭২০পিক্সেলে ভিডিও রেকর্ড করতে পারে এবং রেকর্ডিং-এ কোনো লোগো আসে না
ভলিউম মাস্টার (Volume Master): এটি যেকোনো অডিও বা ভিডিওর ভলিউম ৬০০ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। এটি ল্যাপটপ বা স্পিকারের কম আওয়াজের সমস্যা দূর করে
সুপার ডার্ক মোড (Super Dark Mode): এটি যেকোনো ওয়েবপেজকে ডার্ক মোডে পরিবর্তন করে দেয়, যা বিশেষত রাতে কাজ করার সময় চোখের উপর চাপ কমাতে সাহায্য করে
প্রিন্টলি (Printly): এটি ওয়েবপেজের স্ক্রিনশট নেওয়ার আগে সেখানে অ্যারো, সার্কেল বা অন্য কোনো টীকা (annotation) যোগ করার সুবিধা দেয়
উপসংহারে বলা যায়, এআই টুলগুলি এখন শুধু একটি প্রযুক্তি নয়, বরং এটি সময় ও অর্থ সাশ্রয়, সৃজনশীলতা বৃদ্ধি এবং গবেষণার জন্য একটি অপরিহার্য হাতিয়ার হয়ে উঠেছে
আপনি যদি এআই টুলের ব্যবহারকে একটি মাল্টি-টুলবক্স হিসেবে দেখেন, তবে এটি আপনার হাতে এমন অনেক বিকল্প তুলে দেয়, যা একটি কাজ সম্পন্ন করার জন্য একাধিক পথে এগোতে সাহায্য করে (বিশেষত যখন কোনো ফ্রি টুলের ব্যবহারের সীমা শেষ হয়ে যায়, তখন অন্য টুলটি ব্যবহার করা যায়)

Post a Comment

0 Comments